মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬ - ১১:২৯
শিয়া জ্ঞান-ঐতিহ্যকে জানা শিক্ষার্থীদের সাফল্যের প্রথম ধাপ

হাওজা / হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আব্দুল মাজিদ হাকিম-ইলাহী আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শের বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ সম্পর্কে অবগত থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, ধর্মীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য তালাবা (ধর্মীয় শিক্ষার্থী)দের বিদ্যমান সক্ষমতা সম্পর্কে যেমন জানতে হবে, তেমনি সামনের চ্যালেঞ্জগুলোকেও চিহ্নিত করে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রগতির পথে এগোতে হবে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, পবিত্র কোম নগরের হুজ্জাতিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ভারতীয় তালাবাদের জন্য একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কোমে অবস্থানরত ভারতীয় আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ভারতে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আব্দুল মাজিদ হাকিম-ইলাহী বলেন, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা কেন্দ্রের সাফল্য তিনটি মৌলিক নীতির ওপর নির্ভরশীল। প্রথমত, নিজের সক্ষমতা, সম্পদ ও মূল্যবান ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তৃতীয়ত, এই দুই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

শিয়া জ্ঞান-ঐতিহ্যকে জানা শিক্ষার্থীদের সাফল্যের প্রথম ধাপ

তিনি বলেন, হাওজা বা ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এ আদর্শের অনুসারীরা এমন এক বিশাল জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সম্পদের অধিকারী, যার তুলনা খুব কম মতবাদেই পাওয়া যায়। এই অমূল্য ঐতিহ্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে শুরু হয়ে ইমাম আলী (আ.), পবিত্র ইমামগণ (আ.) এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফকিহ ও মহান চিন্তাবিদদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজ কোমের হাওজায় পৌঁছেছে।

তিনি শাইখ তুসি, শাইখ মুফিদ, শাইখ সাদুক, আল্লামা হিল্লি, খাজা নাসিরুদ্দিন তুসি, সাহিবে জাওয়াহির, শাইখ আযম আনসারি, আখুন্দ খোরাসানি, ইমাম খোমেনি (রহ.), ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা, শহীদ মুর্তজা মোতাহ্হারি এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির সাদরের নাম উল্লেখ করে তাঁদের শিয়া বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানসম্পদ ও গর্ব হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি আরও বলেন, নাহজুল বালাগা, সাহিফা সাজ্জাদিয়া, আল-কাফি, আল-ইস্তিবসার, আল-খিলাফ, আল-আসফার আল-আরবা'আ, জাওয়াহিরুল কালাম, বিহারুল আনওয়ার এবং ওয়াসায়িলুশ শিয়া-র মতো গ্রন্থসমূহ আহলে বাইত (আ.)-এর জ্ঞান-ঐতিহ্যের ব্যাপকতা ও সমৃদ্ধির প্রমাণ।

তিনি বলেন, যেমন কোনো দেশ যুদ্ধে যাওয়ার আগে নিজের সামর্থ্য ও সম্পদ মূল্যায়ন করে, তেমনি ধর্ম, শিক্ষা ও দাওয়াহর কর্মীদেরও প্রথমে নিজেদের বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিতে হবে। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা এক গৌরবময় ঐতিহ্য ও উজ্জ্বল ইতিহাসের উত্তরাধিকারী। তাই এই ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করার পাশাপাশি তা সংরক্ষণ, শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও আপনাদের।

শেষে তিনি বলেন, অতীতের গৌরবের ওপর নির্ভর করলেই সাফল্য আসে না; বর্তমানের সমস্যা, দুর্বলতা ও প্রতিবন্ধকতাকেও গভীরভাবে বুঝতে হবে। একজন মুমিন কখনো হতাশ হন না; বরং আশা, নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, সঠিক পরিকল্পনা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে তিনি উন্নতি ও সফলতার পথে এগিয়ে যান।

আদর্শ শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য

এরপরের অধিবেশনে ভারতে জামিয়াতুল মুস্তাফা আল-আলামিয়া-র প্রতিনিধি হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কামাল হুসাইনি কুরআনের শিক্ষার আলোকে একজন আদর্শ তালাবার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, যে শিক্ষার্থী ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রস্তুতির পথে কাজ করতে চায়, তার মধ্যে নিরলস পরিশ্রম, গতিশীলতা ও অব্যাহত সংগ্রামের মনোভাব থাকতে হবে। তাকে অলসতা, স্থবিরতা ও দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে দূরে থাকতে হবে। এমন একজন শিক্ষার্থীকে সবসময় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সমাজসেবায় সক্রিয় থাকতে হবে। কারণ মহানবী (সা.)-এর শিক্ষায় পরিশ্রমই মানুষের সাফল্যের ভিত্তি।

তিনি বলেন, মহান আলেমদের জীবন ও কর্মপদ্ধতি অধ্যয়ন মানুষের দৃঢ়তা, প্রেরণা ও সংগ্রামী মনোভাবকে শক্তিশালী করে। আল্লামা হিল্লির (রহ.) জীবনের একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শ রক্ষা এবং বিভিন্ন সন্দেহ-আপত্তির জবাব দেওয়ার জন্য তিনি আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দিনরাত গবেষণা ও লেখালেখি করতেন। এই মনোভাবই ধর্মীয় আলেমদের স্থায়ী সাফল্যের রহস্য।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন তালাবার সব প্রচেষ্টার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কারণ মানুষ যখন আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর পথে এগিয়ে যায়, তখন আল্লাহর অনুগ্রহ, হিদায়াত ও সাহায্য তার সঙ্গী হয়।

পড়াশোনা শেষে নিজ দেশে ফিরে সেবা করার আহ্বান

কামাল হুসাইনি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, পড়াশোনা শেষ করে অবশ্যই নিজেদের দেশে ফিরে যেতে হবে। ভারতের মানুষ বিশুদ্ধ ইসলামী জ্ঞান ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার জন্য আগ্রহী। তারা আশা করে, শিক্ষার্থীরা জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা অর্জনের পর নিজেদের দেশের সমাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত হবে।

তিনি আরও বলেন, যেমন আল্লাহর নবীরা জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে সমাজকে পথ দেখিয়েছেন, তেমনি আজকের ধর্মপ্রচারক ও আলেমদেরও হাওজার জ্ঞানের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।

তিনি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কোম নগরের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগগুলো কাজে লাগানোর আহ্বান জানান এবং বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি দাওয়াহ, সামাজিক যোগাযোগ ও নেতৃত্বের দক্ষতাও অর্জন করা উচিত, যাতে দেশে ফিরে তারা আরও কার্যকরভাবে ধর্মপ্রচার ও সমাজসেবায় অবদান রাখতে পারে।

ভারতে হাওজা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ

বক্তৃতার আরেক অংশে তিনি ভারতে হাওজা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ভারতে হাওজা শিক্ষার একটি উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। তাই এই মূল্যবান ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশটির হাওজাগুলোর বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাগত মর্যাদা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।

সভা শেষে বক্তারা ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সাফল্য, জ্ঞানগত অগ্রগতি এবং ক্রমবর্ধমান কল্যাণ কামনা করে আশা প্রকাশ করেন যে আন্তরিকতা, অধ্যবসায়, ঐক্য এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারতে আহলে বাইত (আ.)-এর আদর্শভিত্তিক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha